রমজানে শয়তান বন্দী থাকার পরও মানুষ কেন পাপ করে? - DBS

DBS

দেশ-বিদেশ সংবাদ(Desh-Bidesh Sangbad)

শিরোনাম

Home Top Ad

Post Top Ad

Saturday, February 28, 2026

রমজানে শয়তান বন্দী থাকার পরও মানুষ কেন পাপ করে?

 


আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান মাস আসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৭৭)


হাদিসটি একাধিক বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে। তাই কোনো সন্দেহ নেই, রমজানে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শয়তান বন্দী থাকার পরও কেন মানুষ পাপে লিপ্ত হয়? প্রাজ্ঞ আলেমরা এই প্রশ্নের উত্তর নানাভাবে দিয়েছেন, যা হাদিসের মর্ম ও বার্তা আরো বেশি স্পষ্ট করে। তারা বলেন, বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হওয়ায় রমজান মাসে শয়তানের বন্দী হওয়ার ব্যাপারে যেমন কোনো সন্দেহ নেই, তেমনি মানুষের পাপে লিপ্ত হওয়াটা হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। 


ইমাম ইবনে খুজাইমা (রহ.) বলেন, ‘হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, রমজানে আল্লাহ এক শ্রেণির শয়তানকে বন্দী করেন। সব শয়তানকে বন্দী করেন না। যেমন এক বর্ণনায় এসেছে, রমজানে আল্লাহ অবাধ্য জিন শয়তানদের বন্দী করেন।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা : ৩/১৮৮)


বিখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘এই সম্ভাবনা রয়েছে যে, হাদিসে শয়তান দ্বারা উদ্দেশ্য যারা গোপনে আসমানে আঁড়িপাতার চেষ্টা করে। তাদেরকে রাতের বেলা বন্দী রাখা হয়, দিনে নয়। যদিও কোরআন নাজিল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসমানে তাদের গমন নিষিদ্ধ করা হয়, কিন্তু রমজান এলে তাদের ওপর আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অথবা এর উদ্দেশ্য হলো শয়তান অন্য মাসগুলোতে মুমিনদের যেভাবে প্রতারিত করতে পারে রমজানে সেভাবে পারে না। কেননা রোজা রাখা এবং তিলাওয়াত ও জিকির করার কারণে মুমিনের কুপ্রবৃত্তি দুর্বল হয়ে যায়।’ (ফাতহুল বারি : ৫/২২৯) 


কাজি ইয়াজ (রহ.) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও প্রতিদান বৃদ্ধি করা। কেননা যখন বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও প্রতিদান বৃদ্ধি পায়, তখন বান্দার ওপর শয়তানের প্রভাব কমে যায়। সুতরাং সে অসহায় ও বন্দী হয়ে যায়। তখন হাদিসের উদ্দেশ্য হবে ধোঁকা, প্রতারণা ও প্রলোভনের ক্ষেত্রে শয়তানের শক্তি ও ক্ষমতা খর্ব করা। (ফাতহুল বারি : ৫/২৩০)


আল্লামা শিহাবুদ্দিন তুরবুশতি (রহ.) হাদিসের ব্যাখায় বলেন, ‘জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষণ এবং নেক কাজের প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রতি ইঙ্গিত দেয়; জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা প্রবৃত্তিকে দুর্বল করার মাধ্যমে পাপ ও অশ্লীলতার পথগুলো বন্ধ করার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। আর এই দুটি কাজের ফলাফল হলো শয়তানের বন্দীত্ব। কেননা শয়তান মানুষকে নেক কাজ থেকে দূরে সরাতে চায় এবং পাপে লিপ্ত করতে চায়।’ (নিদাউর রাইয়ান : ১/২৮২)


আল্লামা আলী ইবনে আদম (রহ.) লেখেন, ‘শয়তানের বন্দী হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, মানুষ আর পাপ করবে না। কেননা মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণা ছাড়াও আরো একাধিক কারণে পাপে লিপ্ত হয়। যেমন নিজের ভেতরে থাকা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায়, মন্দ অভ্যাসের কারণে, মন্দ মানুষের প্ররোচনায়। রমজানে শয়তান বন্দী থাকলেও অন্য কারণগুলো বিদ্যমান থাকে।’ (জখিরাতুল উকবা : ২০/২৫৪)


আল্লামা ইবনে আবদুল বার (রহ.) লেখেন, ‘আল্লাহই ভালো জানেন, আমার কাছে মনে হয়, শয়তানকে বন্দী করা হয় কথাটি রূপকার্থে বলা হয়েছে। আর তা হলো আল্লাহ রমজান মাসে মুসলমানদেরকে শয়তানের হাত থেকে অধিক পরিমাণে রক্ষা করেন, যেন তারা পাপে লিপ্ত না হয়। বছরের অন্য সময়ে তাদেরকে এভাবে রক্ষা করা হয় না। ফলে তখন শয়তান অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়।’ (আল ইসতিতজকার : ১০/২৫২)


আল্লামা আবুল ওয়ালিদ আল বাজি (রহ.) লেখেন, ‘শয়তানকে বন্দী করার হাদিসটি প্রকৃত অর্থেও হতে পারে। তখন অর্থ হবে তাকে কিছু কাজ থেকে বিরত রাখা হয়, তাকে পুরোপুরি বিরত রাখা হয় এমন নয়। কেননা হাদিসে ‘সাদাফ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর সাদাফ বলা হয়, ঘাড়ে ও হাতে বেড়ি পরানো। আর যে ব্যক্তির হাতে ও ঘাড়ে বেড়ি পরানো হয় সে কথা বলা, দেখা, ইঙ্গিত করাসহ অনেক কাজই করতে পারে। আবার এই সম্ভাবনাও আছে যে, এই মাসের বরকত, আমলের প্রতিদান ও গুনাহ মার্জনার কারণে শয়তান বন্দীর মতো অসহায় হয়ে যায়। তার প্রচষ্টো ও ধোঁকা মুমিনের জন্য নিস্ফল হয়ে যায়। ফলে সে তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না।’ (আল মুনতাকা : ৩/৯০)


আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) বলেন, শয়তানকে ওই সব রোজাদার থেকে দূরে আবদ্ধ রাখা হয়, যারা রোজার আদব ও শর্ত সঠিকভাবে পালন করে। কিন্তু যারা সেসবের ধার ধারে না, তাদের থেকে শয়তানকে আবদ্ধ নাও রাখা হতে পারে। (উমদাতুল কারি : ১০/২৭০)


সুতরাং শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের যথাযথভাবে রোজা আদায় করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন।

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad